ব্যবসাব্যবসা/বাণিজ্য

ব্যবসায় পরামর্শদাতা হওয়ার উপায়

যেকোনো ব্যবসা শুরু করার পর অনেক চড়াই উৎরাই পাড়ি দেওয়া লাগে যা একার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। প্রয়োজন পড়ে এক দক্ষ পরামর্শদাতার। যে আপনার ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেবে। তবে সবাই এই কাজ করতে পারে না। এ কাজ করার জন্য লাগে বিশেষ কিছু গুণ আর যাদের নির্দিষ্ট বিষয়ে অগাধ জ্ঞান, লোকজনদের পরামর্শ দেওয়া বা জ্ঞান শেয়ার করার জন্য মুখিয়ে থাকে তারাই কনস্যালটেন্ট বা পরামর্শদাতা হওয়ার ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে। তাছাড়া যারা কোনো সংস্থার হয়ে কাজ করতে চায় তাদেরকে বলা হয় বিজনেস কনস্যালটেন্ট বা ব্যবসায় পরামর্শদাতা। ব্যবসা কিভাবে বাজারে পরিচিত পাবে, কিভাবে প্রচার-প্রসার ঘটবে, উন্নতি হবে ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়ায় এদের মূল কাজ। সময়ের চাহিদায় ব্যবসায় পরামর্শদাতার প্রয়োজন বাড়ছে। এর সাথে বাড়ছে প্রতিযোগিতাও। আর আপনি ইচ্ছে করলেই তো এ পেশায় আসতে পারবেন না এজন্য পেরোতে হবে বেশ কিছু ধাপ। এছাড়া কোন ধরণের পরামর্শদাতা আপনি হতে চাচ্ছেন সেটাও আপনাকে বেছে নিতে হবে। আর এসব বিষয় নিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের আর্টিকেল। তাই আর কথা না বাড়িয়ে জেনে নেওয়ার যাক ব্যবসায়ে পরামর্শদাতা হওয়ার ৪টি কার্যকরী উপায়। 

ব্যবসায় পরামর্শদাতা হওয়ার ৪ উপায়

১. গবেষণা করা

যেকোনো গবেষণা অনেক গুরুত্বের সাথে করা দরকার। জীবনের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মতো, নিজের গবেষণাটিও করা হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে নিবেন। ব্যবসায় পরামর্শদাতা (business consultant) আপনার ক্যারিয়ার যাত্রায় প্রথম বা পরে আসবে কিনা তা খুব গুরুত্বের সাথে ভেবে নিবেন। 

নিজেকে প্রশ্ন করুন, কনসালটিং কেন? ক্যারিয়ারটি আপনাকে কীভাবে আকষর্ণ করে? এটি কি টেকসই ক্যারিয়ারের পথ হবে?  আপনি যে শিল্পটির সাথে পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করতে চান সে সম্পর্কে কি যথেষ্ট জানেন? আর এসব কিছু মন মতো হলেই ব্যবসায় পরামর্শদাতার পথে পা বাড়ান। 

২. ইন-হাউস বা নিজের এজেন্সি খোলা

পরামর্শের কাজ করার কথা বলতে গেলে তিনটি রুট থাকে। সুতরাং নিশ্চিত হয়ে নিন যে আপনি সঠিক ট্রাকে আছেন কিনা। ইন-হাউজ বা অভ্যন্তরীণ পরামর্শ হ’ল আপনি যেখানে কোনও নির্দিষ্ট সংস্থার অভ্যন্তরীণ কাজ করেন সেখানে যেকোনো ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য পরামর্শ এবং প্রয়োগের জন্য কোম্পানির যেকোনো সহকর্মীর সাথে বা দলগতভাবে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করবেন। কোনো কোম্পানির সাথে কাজ করার সময় তাদের চুক্তিপত্রে স্বাক্ষরিত হওয়া এবং হয়েছেন এবং  তারা আপনাকে ক্লায়েন্ট, প্রকল্প এবং চুক্তির ভিত্তিতে কোনও সেক্টরে কাজ করার জন্য নিয়োগ দেবে। 

তাছাড়া  আপনার ইচ্ছা বলে নিজেই পরামর্শের ব্যবসা শুরু করতে পারেন এজন্য আপনার পরামর্শদাতার যথাযথ লাইসেন্স থাকা জরুরী। তবে আপনি যে পরামর্শ ক্লায়েন্টের মনঃপুত না হলে আপনি দায়বদ্ধ  হবেন এবং আপনার আর্থিক ও যশ নষ্ট হয়ে যেতে  পারে। তাই নিজের ব্যবসায় পরামর্শদাতার প্রতিষ্ঠান খুলতে গেলে অবশ্যই ক্লায়েন্টের কথা মাথায় রাখবেন আর সংস্থার হয়ে কাজ করলেও সবার সাথে মিল রেখে কাজ করবেন এতে চাকরি হারানোর ভাবনায় পড়তে হবে না। 

৩. যে  ধরনের ব্যবসায় পরামর্শদাতা হতে পারবেন

  • ব্যবস্থাপনা

এই ধরণের পরামর্শদাতারা ব্যবসায়িক  বিভিন্ন উপাদানের দিকে মনোনিবেশ করে যা সাধারণ ব্যবসায়িক ক্রিয়াকলাপ থেকে শুরু করে আরও জটিল সাংগঠনিক উদ্বেগ পর্যন্ত কোনও বিষয়ে কাজ করতে পারে। 

  • অপারেশন

অপারেশন কনসালট্যান্টের কাজ হ’ল কোনও ব্যবসায়ের উপদেষ্টা স্তরে বা হ্যান্ড-অন বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের ক্রিয়াকলাপ উন্নত ও প্রবাহিত করা। ব্যবসায় অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে বা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন অথবা নতুন প্রযুক্তি চালু হলে তখন এখন একজন অপারেশন কনসালট্যান্ট সময়ের চাহিদায় কিভাবে দক্ষতা বাড়ানো যায়, খরচ কমানো যায় ও মান উন্নত করা যায় সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। মূলত একজন অপারেশন বিজনেস কনসালট্যান্ট সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের মতো কাজ করে। 

  • কৌশল

কৌশল বা স্ট্রাটেজি পরামর্শদাতারা সাধারণত ব্যবসায়ের সর্বোচ্চ স্তরে কাজ করে এবং কর্পোরেট এবং সাংগঠনিক কৌশলে ফোকাস করে। 

  • আর্থিক

আর্থিক পরামর্শদাতারা এক ধরণের আর্থিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেন যা তাদের ক্লায়েন্টদের তাদের আর্থিক আরও ভালভাবে বুঝাতে সহায়তা করার জন্য বড় ব্যবসায়ী এবং ব্যক্তি উভয়ের সাথে কাজ করতে পারে। 

  • এইচআর

ব্যবসার গতি ঠিক রাখার জন্য দীর্ঘসময় ধরে কর্মচারীদের কার্যকরীভাবে ম্যানেজমেন্ট করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ম্যানেজমেন্টের মতো কঠিন কাজটা করতে প্রয়োজন পড়ে একজন দক্ষ এইচআর বা হিউম্যান রির্সোস পরামর্শদাতাদের। কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন, কর্মচারীর সন্তুষ্টি এবং পারস্পারিক দ্বন্ধের সমাধান সুষ্ঠভাবে করার জন্য একজন মানবসম্পদ পরামর্শদাতার ডাক পড়ে। অর্থ্যাৎ একজন এইচআর পরামর্শদাতা আপনার প্রতিষ্ঠানের নীতি ও পদ্ধতি যথাযথ আইন ও প্রবিধান মেনে চলে কিনা, প্রশিক্ষণ সেশন তৈরি করতে হবে কি না এবং কর্মচারীদের সন্তুষ্টি কীভাবে উন্নত করতে হবে, কর্মচারীদের তাদের ক্লায়েন্টদের পরিচালনার পরিবর্তন, চাকরির শর্তাবলী পরিবর্তন, শিখন, বিকাশ, প্রতিভা পরিচালনার বিষয়গুলো তদারকি করবেন।

  • আইটি

আইসিটি, প্রযুক্তি বা ডিজিটাল পরামর্শদাতা হিসেবে পরিচিত, এই ধরণের পরামর্শদাতারা ক্লায়েন্টদের তাদের ব্যবসাগুলো আইটিতে বিকাশ এবং প্রয়োগ করতে সহায়তা করে। এটি বৃহৎ আকারের আইটি প্রয়োগকরণ থেকে শুরু করে ছোট বা প্রতিদিন-রক্ষণাবেক্ষণের কাজ পর্যন্ত হতে পারে।

  • সেলস কনস্যালট্যান্ট

কোনো প্রতিষ্ঠানের বা ব্যবসার পণ্যর উপর বেচার উপর বাঁচা মরা নির্ভর করে। যেকোনো ব্যবসার তাদের পণ্যর উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। কারণ পণ্যই যে তাদের ময়দানে টিকে থাকার একমাত্র উপায়। আর পণ্যর বিক্রয়ের উপর ব্যবসা টিকে থাকে। 

এক্ষেত্রে একজন সেলস কনস্যালট্যান্ট বিক্রয়কর্মীদের সঠিক প্রশিক্ষণের উপর মনোযোগ বাড়ায়, বিক্রয় বাড়ানো কৌশল সম্পর্কে পরামর্শ দেয়, বর্তমান পণ্যর বিক্রয় প্রক্রিয়া উন্নত করার চেষ্টা করে, পণ্যর নতুন সুযোগ সনাক্ত করে এবং সেগুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায় সে সম্পর্কে পরামর্শ দেয় এবং বিক্রয়কর্মীদের পূর্বের পারফরম্যান্সের আরো ভালো করতে উৎসাহ দেয়।

৪. কিভাবে ক্লায়েন্ট পাবেন

আপনি যদি ফ্রিল্যান্সের বা মুক্তপেশার রাস্তায় নেমে নিজের ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত  নিতে চাইলে আপনাকে কাজে  নিবে এমন ক্লায়েন্ট খুঁজে পেতে হবে। আর যেসব উপায়ে ক্লায়েন্ট খুঁজে পেতে পারেন তন্মধ্যে রয়েছেঃ 

  • নেটওয়ার্কিং বাড়ান

নেটওয়ার্কিং এর মাধ্যমে দক্ষতার পরিচয় মিললে আপনি খুব সহজেই ঘাটে লাগতে পারেন। এজন্য আপনি আপনার বন্ধু, সিনিয়র, জুনিয়র সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখুন। তাদেরকে আপনার প্রয়োজনটা জানান। মাঝে মাঝেই তাদের সাথে যোগাযোগ করুন। নেটওয়ার্কিং বাড়ান। আর এই সম্পর্কগুলো তৈরি করে আপনি তাদের মনে থাকার সম্ভাবনাগুলোও বাড়িয়ে তুললে সহজেই যেকোন কর্মক্ষেত্রে যেতে পারবেন। 

  • অনলাইন প্লাটফর্ম তৈরি এবং কন্টিনিউ রাখা

বর্তমানে অনলাইন অনেক সহজবোধ্য হওয়ায় এ দিকেই সবাই ঝুঁকছে। আর অনলাইন প্লাটফর্ম তৈরির অর্থ হ’ল একটি পেশাদার এবং ব্যবহারকারী-বান্ধব ওয়েবসাইট তৈরী করা। শুধু ওয়েবসাইট তৈরি করে ক্ষান্ত হলে হবে না আপনার ব্যবসা বাড়ানোর  সুবিধার্থে এসইও বা সার্চ ইঞ্জিন অপটামাইজেশন এর কৌশলগুলো ব্যবহার করুন এবং ক্যাথো ও লিংকডিন এর মতো ব্যবসা সম্পর্কিত সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রোফাইল তৈরি করে নিন। এবং মাঝে মাঝেই  আপনার পর্যায়ের বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক রাখুন। 

  • অংশীদার বা পার্টনার

আমাদের শিল্পের কারও সাথে অংশীদারিত্ব করে কিছুটা গুঞ্জন তৈরির কাজ কেন করবেন না, যারা অবশ্যই প্রতিযোগী নন। তাদের সাইটের জন্য কোনও গেস্ট পোস্ট লেখার অফার করুন বা তাদের আপনার পোস্ট করুন, তাদের সাক্ষাতকার দিন এবং ইন্টারঅ্যাক্ট করতে দেখেন। 

  • হাল ছেড়ে দেবেন না

যখনই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায় তখন অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন এবং হাল ছেড়ে দেয়। তবে লেগে থাকুন, হাল ছেড়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনার কাজটি যত বেশি কঠিন হবে, তত বেশি আপনি ধীরে ধীরে হালকা হয়ে যাবেন এবং এক সময়ে দক্ষ হয়ে উঠবেন।  

শেষকথা

ব্যবসায় পরামর্শদাতা হওয়া মোটেও সহজ বিষয় না। আপনার অনেক জ্ঞান থাকা দরকার হয়। আপনার পরিশ্রম, ধৈর্য্য সবকিছুর প্রয়োজন পড়ে। যে ধরনের পরামর্শ আপনি পেশা হিসেবে বেছে নিবেন তার উপকারিতা সম্পর্কে জানুন এবং এর জন্য যথেষ্ট সময় নিন। সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি হলে অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিবেন। আর অবশ্যই যে বিষয়ে পরিকল্পনা নিয়েছেন সে সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান রাখলে সাফল্য আপনার কাছে অবশ্যই ধরা দিবে।

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button